August 1, 2026, 2:48 AM

ফিফা সভাপতি ইনফান্তিনোর সিনিয়র উপদেষ্টার পদত্যাগ

খেলা প্রতিবেদক
প্রকাশ ৩১ জুলাই, ২০২৬
ইনফান্তিনোর সিনিয়র উপদেষ্টার পদত্যাগ
ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো এবং যুক্তরাষ্ট্র ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি কার্লোস কর্দেইরোর সঙ্গে বৈঠকের সময় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হাতে একটি লাল কার্ড তুলে ধরেন।

বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার একটি নতুন বাণিজ্যিক ও বেসরকারি বিনিয়োগ পরিকল্পনাকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক ফুটবল মহলে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর এই প্রস্তাবের জেরে ইতিমধ্যেই শীর্ষ এক উপদেষ্টার পদত্যাগ, উয়েফা ও এএফসি-র মতো বৃহৎ সংস্থাগুলোর বয়কটের হুমকি এবং বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক ও ক্রীড়া ব্যক্তিত্বদের সমালোচনার মুখে পড়েছে সংস্থাটি।

কী আছে ফিফার বিতর্কিত প্রস্তাবে?

গত মঙ্গলবার ফিফা একটি নতুন বিনিয়োগ পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করে, যার মূল লক্ষ্য বাণিজ্যিক কার্যক্রম থেকে বিপুল অর্থ সংগ্রহ করা।

  • বাণিজ্যিক স্বত্ব: প্রস্তাব অনুযায়ী, ‘ফিফা ফরওয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ’ (FFE) নামের একটি বাণিজ্যিক সহযোগী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিশ্বকাপ ও ক্লাব বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।
  • অর্থ সংগ্রহ: প্রতিষ্ঠানটির মোট মূল্য ২০ বিলিয়ন ডলার নির্ধারণ করে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে সংখ্যালঘু শেয়ার বিক্রির মাধ্যমে সর্বোচ্চ ৪ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে।
  • সদস্যদের জন্য আর্থিক প্রলোভন: প্রস্তাবটি পাস হলে ফিফার ২১১টি সদস্য দেশ ২০২৭ সালের শুরুতে এককালীন ২০ মিলিয়ন ডলার করে পাবে। এছাড়া ২০২৭-২০৩০ চক্রে নিয়মিত বরাদ্দ ৮ মিলিয়ন থেকে বেড়ে ২০ মিলিয়ন ডলার হবে।
  • ফিফার দাবি: সভাপতি ইনফান্তিনো একে ফুটবলের উন্নয়নের জন্য ‘সুবর্ণ সুযোগ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

কার্লোস কর্দেইরোর পদত্যাগ

ফিফার এই পরিকল্পনার প্রতিবাদে সভাপতি ইনফান্তিনোর সিনিয়র উপদেষ্টা এবং যুক্তরাষ্ট্র ফুটবল ফেডারেশনের সাবেক প্রধান কার্লোস কর্দেইরো পদত্যাগ করেছেন।

  • তার বক্তব্য: পদত্যাগপত্রে তিনি স্পষ্ট জানান, এই পরিকল্পনার সাথে তার কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না। তিনি বলেন, “বিশ্বকাপের অংশীদারিত্ব বিক্রির বিষয়টি বিবেচনা করার সময় আমি নীরব থাকতে পারি না। এটি ফিফার সদস্য, ফুটবল এবং খেলাটির দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যতের জন্য একটি খারাপ চুক্তি।”

মহাদেশীয় সংস্থাগুলোর কঠোর অবস্থান ও বয়কটের হুমকি

ফিফার এই প্রস্তাবের বিরুদ্ধে বিশ্বের প্রধান ফুটবল কনফেডারেশনগুলো একজোট হয়েছে:

  • উয়েফা (UEFA): সবচেয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে ইউরোপীয় নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। তারা হুমকি দিয়েছে, প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত হলে তাদের কোনো দল ফিফার প্রতিযোগিতায় অংশ নেবে না। উয়েফা সভাপতি আলেকসান্দার সেফেরিন বলেন, “বিশ্বকাপ কোনো বিনিয়োগ পণ্য নয় এবং এটি বিক্রির জন্য নয়। আর্থিক লাভের জন্য ফুটবল তার ভবিষ্যৎ বন্ধক রাখতে পারে না।” ইউরোপীয় ইউনিয়নও উয়েফার এই অবস্থানকে সমর্থন জানিয়েছে।
  • কনকাকাফ (CONCACAF): উত্তর ও মধ্য আমেরিকার নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির ৪১টি সদস্য দেশ সর্বসম্মতিক্রমে ফিফার এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে।
  • এএফসি (AFC): উয়েফা ও কনকাকাফের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে। তারা সতর্ক করে বলেছে, পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে ‘বিশ্বকাপ বয়কট’-এর বাস্তব সম্ভাবনা এখন প্রকাশ্য আলোচনায় উঠে এসেছে।

মাঠের বাইরের সমালোচনা

ফুটবল প্রশাসনের বাইরেও এই প্রস্তাব তীব্র সমালোচনার জন্ম দিয়েছে:

  • কোচদের মত: চেলসির কোচ ও স্পেনের বিশ্বকাপজয়ী তারকা জাবি আলোনসো বর্তমান ব্যবস্থার প্রশংসা করে ফুটবলের স্বার্থ রক্ষার আহ্বান জানিয়েছেন।
  • রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া: যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম প্রস্তাবটিকে ‘আপত্তিকর’ আখ্যা দিয়ে বলেছেন, ইনফান্তিনো ফিফাকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য ভুল ব্যক্তি।
  • স্পন্সরদের কটাক্ষ: ফিফার অন্যতম স্পন্সর একটি বিয়ার ব্র্যান্ড ব্যঙ্গাত্মক বিজ্ঞাপনে ইনফান্তিনোকে উদ্দেশ্য করে লিখেছে— “জিয়ান্নি, হাইড্রেশন ব্রেক নেওয়ার সময় হয়েছে? সম্ভবত।”

ফিফার আত্মপক্ষ সমর্থন

তীব্র বিরোধিতার মুখে ফিফা জানিয়েছে:

  • তারা ফুটবল বা বিশ্বকাপ বিক্রি করছে না।
  • কিছু ভুল সংবাদের কারণে মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়িয়েছে।
  • তারা প্রকাশ্য উদ্বেগগুলোকে সম্মান করে এবং একটি ‘উন্মুক্ত ও গণতান্ত্রিক’ পরামর্শ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সকল সদস্য দেশকে সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে ভোট দেওয়ার সুযোগ করে দেবে।

উপসংহার

বাণিজ্যিকীকরণের নামে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের হাতে ফুটবলের নিয়ন্ত্রণ তুলে দেওয়ার এই প্রস্তাব ফিফাকে স্মরণকালের অন্যতম বড় সংকটে ফেলেছে। একদিকে ফিফা তাদের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় এটি সমাধানের কথা বলছে, অন্যদিকে মহাদেশীয় সংস্থাগুলোর বয়কটের হুমকি এবং শীর্ষ কর্মকর্তাদের পদত্যাগ পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। ফিফা এই পরিকল্পনা থেকে সরে আসবে নাকি সংঘাতের পথেই হাঁটবে—সেদিকেই এখন তাকিয়ে আছে পুরো ফুটবল বিশ্ব।


এই ক্যাটাগরির আরো খবর
Theme Created By ThemesDealer.Com