ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর শেষ ১৬-এর ম্যাচে মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে এক মহাকাব্যিক ও শ্বাসরুদ্ধকর লড়াইয়ের সাক্ষী হলো ফুটবল বিশ্ব। মিশরের কাছে ম্যাচ থেকে প্রায় ছিটকে গিয়েও অবিশ্বাস্য এক রূপকথার জন্ম দিল ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। ২-০ গোলে পিছিয়ে পড়ার পর শেষ মুহূর্তের ম্যাজিকে মিশরকে ৩-২ ব্যবধানে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট কেটেছে আলবিসেলেস্তেরা।
ম্যাচের প্রথমার্ধেই বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের স্তব্ধ করে দেয় মিশর। ইয়াসের ইব্রাহিমের করা এক চমৎকার গোলে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে থেকে প্রথমার্ধ শেষ করে ফারাওরা। অন্যদিকে প্রথমার্ধে আর্জেন্টিনা একের পর এক সুযোগ হাতছাড়া করে। ম্যাচের স্কোরলাইন যখন ১-০, তখন লিওনেল মেসির একটি শট পোস্টে লেগে ফিরে আসে। এর কিছুক্ষণ পর পেনাল্টি থেকে সমতায় ফেরার সুবর্ণ সুযোগ পেলেও মেসির স্পট কিকটি দারুণভাবে রুখে দেন মিশরীয় গোলরক্ষক মোস্তফা শৌবির।
দ্বিতীয়ার্ধের ৫৮তম মিনিটে কাউন্টার অ্যাটাক থেকে গোল করে মিশরকে ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে নিয়েছিলেন মোস্তফা জিকো। মাঝমাঠ থেকে এক দুর্দান্ত দৌড়ে আর্জেন্টিনার ডিফেন্ডারদের পরাস্ত করে বল জালে জড়িয়েছিলেন তিনি। গোলটি হতে পারতো ২০২৬ বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা গোলগুলোর একটি।
তবে মিশরের সেই আনন্দ স্থায়ী হয়নি। আক্রমণের শুরুতে (Build-up) কোনো ফাউল হয়েছিল কি না, তা পরীক্ষা করতে প্রযুক্তির সাহায্য নেন ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (VAR)। দীর্ঘ স্ক্রিন রিভিউর পর দেখা যায়, আক্রমণের সূত্রপাতের সময় মিশরের হাইসেম হাসান আর্জেন্টিনার ডিফেন্ডার লিসান্দ্রো মার্টিনেজকে ফাউল করেছিলেন। ফলে রেফারি গোলটি বাতিল করেন। ম্যাচ থেকে ছিটকে যাওয়ার মুহূর্তে এই সিদ্ধান্তটি আর্জেন্টিনার জন্য এক বিশাল লাইফলাইন হিসেবে কাজ করে।
গোলটি বাতিল হলেও এর কিছুক্ষণ পর, ৬৭তম মিনিটে জিকো আরেকটি বৈধ গোল করে মিশরকে ঠিকই ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে দেন।)
২-০ গোলে পিছিয়ে পড়ার পর দ্বিতীয়ার্ধের হাইড্রেশন ব্রেকের সময় মেসিসহ আর্জেন্টিনার ফুটবলারদের মাথা নিচু ও বিধ্বস্ত দেখাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের বিদায় এবার সময়ের ব্যাপার মাত্র। কিন্তু সেখান থেকেই শুরু হয় লা আলবিসেলেস্তেদের রাজকীয় প্রত্যাবর্তন।
আশার আলো (৭৯ মিনিট): ক্রিশ্চিয়ান রোমেরোর একটি জোরালো হেড গোলরক্ষক শৌবির পুরোপুরি রুখতে না পারলে বল জালে জড়ায়। আর্জেন্টিনা ফিরে পায় তাদের হারিয়ে যাওয়া প্রাণ (২-১)।

মেসির রাজকীয় সমতা (৮৩ মিনিট): গোল পাওয়ার পর যেন চিতা বাঘের মতো জেগে ওঠে আর্জেন্টিনা। কিছুক্ষণ পরেই মেসির এক জাদুকরি পাস থেকে লাউতারো মার্টিনেজ হেড করলেও তা অল্পের জন্য লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। তবে এর ঠিক সাত মিনিট পর আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। গঞ্জালো মন্তিয়েলের পাস থেকে বক্সের ভেতর বল পেয়ে দুর্দান্ত এক হাফ-ভলিতে বল জালে পাঠান অধিনায়ক লিওনেল মেসি। বলটি বারে লেগে জালে জড়ালে টুর্নামেন্টে নিজের ২১তম বিশ্বকাপ গোলটি উদযাপন করেন মেসি (২-২)।

ইনজুরি টাইমের জয়ধ্বনি (৯০+২ মিনিট): ম্যাচ যখন টাইব্রেকারের দিকে এগোচ্ছে, ঠিক তখনই ম্যাচের যোগ করা সময়ে লাউতারো মার্টিনেজের মাপা ক্রস থেকে বুলেট হেডে গোল করেন এনজো ফার্নান্দেজ। পুরো স্টেডিয়ামকে উল্লাসে ভাসিয়ে আর্জেন্টিনা পূর্ণ করে তাদের অলৌকিক জয় (৩-২)।

ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজার পর আর্জেন্টিনার খেলোয়াড় ও সমর্থকদের মাঝে দেখা যায় বাঁধভাঙা স্বস্তির উল্লাস। পরাজয়ের মুখ থেকে জয় ছিনিয়ে নিয়ে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা প্রমাণ করলো—কেন তাদের ফুটবলের রাজা বলা হয়।