ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা আরও একবার তাদের শিরোপা ধরে রাখার লড়াইয়ে একধাপ এগিয়ে গেল। নাটকীয়তায় ঠাসা এক কোয়ার্টার ফাইনালে ১০ জনের সুইজারল্যান্ডকে হারিয়ে সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনা । আগামী বুধবার আতলান্তায় ফাইনালের টিকিট কাটার লড়াইয়ে লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা মুখোমুখি হবে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ইংল্যান্ডের।
শনিবার কানসাস সিটি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত এই ম্যাচে আর্জেন্টিনার জয়ের নায়ক জুলিয়ান আলভারেজ। অতিরিক্ত সময়ে তাঁর করা ২৫ গজ দূর থেকে এক দুর্দান্ত দূরপাল্লার শটই মূলত ম্যাচের ভাগ্য গড়ে দেয়।
খেলার শুরুটা আর্জেন্টিনার জন্য ছিল দারুণ। ম্যাচের ১০ম মিনিটেই ফুটবল জাদুকর লিওনেল মেসির নিখুঁত এক ক্রস থেকে দুর্দান্ত হেডে গোল করে আর্জেন্টিনাকে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে নেন অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার।
তবে শুরুর এই আধিপত্য ধরে রাখতে পারেনি দক্ষিণ আমেরিকার দলটি। ম্যাচের বাকি সময় আর্জেন্টিনা যেমন আধিপত্য বিস্তার করে খেলতে চেয়েছিল, তা দেখা যায়নি। উল্টো ইউরোপের দল সুইজারল্যান্ড ম্যাচে ফেরার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে এবং বেশ কিছু দারুণ আক্রমণ শাণায়। অবশেষে ৬৭ মিনিটে সুইজারল্যান্ডের সেই প্রচেষ্টার ফল আসে। দান এনদয়ে ক্লোজ-রেঞ্জ থেকে নিখুঁত শটে বল জালে জড়িয়ে সুইসদের ১-১ সমতায় ফেরান।
ম্যাচের ৭২ মিনিটে দেখা দেয় চরম বিতর্ক ও নাটকীয়তা। সুইস ফরোয়ার্ড ব্রিল এম্বোলো ডাইভ দিয়ে ফ্রি-কিক আদায়ের চেষ্টা করলে পর্তুগিজ রেফারি জোয়াও পিনহেইরো প্রথমে আর্জেন্টিনার লিয়েন্দ্রো পারাদেসকে ফাউলের জন্য হলুদ কার্ড দেখান। কিন্তু এখানেই ত্রাতা হয়ে আসে এই বিশ্বকাপের নতুন প্রযুক্তি ও নিয়ম।

নতুন ভার (VAR) নিয়ম: এবারের টুর্নামেন্টে ‘ভুল খেলোয়াড়কে কার্ড দেওয়া’ বা ‘mistaken identity’র বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করার যে নতুন নিয়ম যুক্ত হয়েছে, তার মাধ্যমে ম্যাচ অফিশিয়ালরা রেফারিকে সিদ্ধান্ত বদলাতে অনুরোধ করেন।
রিপ্লেতে দেখা যায় এম্বোলো পেনাল্টি বক্সের সামনে ইচ্ছাকৃতভাবে ডাইভ দিয়েছেন (সিমুলেশন)। ফলে রেফারি তাঁর আগের সিদ্ধান্ত বদলে পারাদেসের কার্ড বাতিল করেন এবং এম্বোলোকে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড (লাল কার্ড) দেখিয়ে মাঠ ছাড়া করেন। কাঁদতে কাঁদতে মাঠ ছাড়তে হয় সুইস ফরোয়ার্ডকে।
১০ জনের সুইজারল্যান্ডের ওপর নির্ধারিত সময়ের শেষ দিকে প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে আর্জেন্টিনা। একদম শেষ মুহূর্তে লিসান্দ্রো মার্টিনেজ বক্সের ভেতর একটি আলগা বল পেয়ে দুর্দান্ত সিজার-কিক নিলেও তাতে গোলরক্ষককে পরাস্ত করার মতো পর্যাপ্ত গতি ছিল না।
এর কিছুক্ষণ আগে লিওনেল মেসি নিজেই গোলরক্ষককে একা পেয়ে ওয়ান অন ওয়ান পজিশনে চিপ করেছিলেন, যা রুখে দেন সুইস কিপার। সহকারী রেফারি অফসাইডের পতাকা তুললেও রিপ্লেতে দেখা গেছে গোল হলে সেটি হয়তো বৈধ বলেই গণ্য হতো। গোলটি হলে চলতি টুর্নামেন্টে ৬ ম্যাচে মেসির ৯ম গোল হতো এটি।
নির্ধারিত ৯০ মিনিট ১-১ সমতায় শেষ হওয়ার পর ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। অবশেষে ১১২ মিনিটে ডেডলক ভাঙেন জুলিয়ান আলভারেজ। ২৫ গজ দূর থেকে তাঁর নেওয়া এক বুলেট গতির শট সুইজারল্যান্ডের জালের ডান দিকের ওপরের কোণায় আশ্রয় নেয় (২-১)।
ম্যাচের একদম শেষ সেকেন্ডে সুইজারল্যান্ড সমতায় ফিরতে অল-আউট আক্রমণে গেলে তাদের রক্ষণভাগ পুরোপুরি ফাঁকা হয়ে পড়ে। এই সুযোগে থিয়াগো আলমাদার একটি কাউন্টার অ্যাটাক থেকে ডিফ্লেক্টেড বল পেয়ে লাউতারো মার্টিনেজ গোল করে আর্জেন্টিনার ৩-১ ব্যবধানের জয় নিশ্চিত করেন।
আর্জেন্টিনা এখন সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হবে। অন্যদিকে, দ্বিতীয় সেমিফাইনালে মুখোমুখি হচ্ছে স্পেন ও ফ্রান্স (যাদের আর্জেন্টিনা ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালে হারিয়েছিল)।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত কেবল দুটি দেশ টানা দুবার শিরোপা ধরে রাখতে পেরেছে, ইতালি এবং ব্রাজিল। আর্জেন্টিনার সামনে এখন সেই এলিট ক্লাবে যোগ দেওয়ার সুযোগ। তবে ৩৯ বছর বয়সী লিওনেল মেসির দলের জন্য পথটা সহজ হবে না। রাউন্ড অব ৩২ এ কেপ ভার্দে এবং এবার সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে, টানা ম্যাচ অতিরিক্ত সময়ে গড়ানোয় দলের ওপর শারীরিক ও মানসিক ধকল যাবে বেশ।
অবশ্য সেমিফাইনালের প্রতিপক্ষ ইংল্যান্ডও শনিবার নরওয়েকে হারাতে অতিরিক্ত সময় পর্যন্ত খেলেছে। ফলে ক্লান্তি দুই দলের জন্যই সমান ভাবনার বিষয়। তবে ৩৯ বছর বয়সেও মেসি যেভাবে সময়কে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে চলছেন, তাতে বুধবার আতলান্তায় আরও একটি জাদুকরী মুহূর্ত উপহার দেওয়ার জন্য আলবিসেলেস্তে সমর্থকরা আশায় বুক বাঁধতেই পারেন।