বাংলাদেশে ফুটবল বিশ্বকাপের সময় আর্জেন্টিনা দলকে নিয়ে যে উন্মাদনা দেখা যায়, তা বিশ্বজুড়ে এক অনন্য নজির। লাতিন আমেরিকার একটি দেশকে বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষ কেন নিজের দেশের মতো সমর্থন করে, তার পেছনে রয়েছে কিছু দারুণ ঐতিহাসিক, মনস্তাত্ত্বিক ও আবেগীয় কারণ।
বাংলাদেশের মানুষের আর্জেন্টিনা সমর্থক হওয়ার মূল ভিত্তিটা তৈরি হয়েছিল ১৯৮৬ বিশ্বকাপে ডিয়েগো ম্যারাডোনার হাত ধরে। সেই সময়ে বাংলাদেশে প্রথম রঙিন টেলিভিশনে বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা সম্প্রচার শুরু হয়। ম্যারাডোনার একক নৈপুণ্যে আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ জয় এবং তার সেই বিখ্যাত ‘হ্যান্ড অব গড’ ও ‘শতাব্দীর সেরা গোল’ সাধারণ মানুষের মনে গেঁথে যায়। তৎকালীন প্রজন্মের কাছে ম্যারাডোনা কেবল একজন ফুটবলার ছিলেন না, ছিলেন এক রূপকথার নায়ক। সেই আবেগই প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়েছে।

বাংলাদেশ ও আর্জেন্টিনা দুই দেশই কোনো না কোনো সময় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের শিকার বা শোষণের মুখোমুখি হয়েছিল। ১৯৮২ সালে ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে আর্জেন্টিনা ও ব্রিটেনের মধ্যে যুদ্ধ হয়, যাতে আর্জেন্টিনা পরাজিত হয়। এর ঠিক চার বছর পর, ১৯৮৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ম্যারাডোনা যখন একক শক্তিতে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে দেন, তখন বাংলাদেশের মানুষের কাছে মনে হয়েছিল এটি শোষিতদের পক্ষ থেকে শোষকদের বিরুদ্ধে এক প্রতীকী প্রতিশোধ। এই মনস্তাত্ত্বিক সংযোগ আর্জেন্টিনাকে বাঙালিদের ঘরের দল বানিয়ে তোলে।
ম্যারাডোনার যুগে যারা আর্জেন্টিনার ভক্ত হয়েছিলেন, তাদের সন্তান বা বর্তমান তরুণ প্রজন্ম এই সমর্থন ধরে রেখেছে লিওনেল মেসির কারণে। সর্বকালের অন্যতম সেরা এই ফুটবলারের পায়ের জাদু, তার বিনম্র ব্যক্তিত্ব এবং ২০২২ বিশ্বকাপে তার হাতে ট্রফি দেখার দীর্ঘ প্রতীক্ষা বাংলাদেশের তরুণ সমাজকে আর্জেন্টিনার প্রতি আরও বেশি আবেগপ্রবণ করে তুলেছে।
বাংলাদেশে ফুটবল সমর্থন অনেকটাই পারিবারিক ঐতিহ্যের মতো। বাবা বা বড় ভাই আর্জেন্টিনার সমর্থক হলে, ছোটবেলা থেকেই পরিবারের বাকি সদস্যরাও আলবিসেলেস্তেদের (আর্জেন্টিনা দলের ডাকনাম) আকাশী-সাদা জার্সির প্রেমে পড়ে যায়। পাড়ায় পাড়ায় বড় পতাকা টাঙানো, দেয়ালে চুনকাম করা বা এক সাথে বসে খেলা দেখার যে সংস্কৃতি, তা এই সমর্থনকে আরও উৎসবমুখর করে তোলে।
বাংলাদেশি সমর্থকদের এই পাগলামি এখন আর একতরফা নয়। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের সময় বাংলাদেশের মানুষের উন্মাদনা আর্জেন্টিনার গণমাধ্যম, ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন এবং সাধারণ মানুষের নজর কাড়ে। আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি থেকে শুরু করে দেশটির সাধারণ নাগরিকরা বাংলাদেশের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। এই ভালোবাসার জের ধরেই ২০২৩ সালে ঢাকায় আর্জেন্টিনার দূতাবাস পুনরায় উন্মুক্ত করা হয়। এই দ্বিপাক্ষিক আন্তরিকতা বাংলাদেশের মানুষের মনে আর্জেন্টিনার প্রতি ভালোবাসাকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, ১৯৮৬ সালে যে ভালোবাসার শুরু হয়েছিল ডিয়েগো ম্যারাডোনার হাত ধরে, ২০২৬ সালেও এসেও লিওনেল মেসি এবং দুই দেশের পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের কারণে তা সমানভাবে, বা তার চেয়েও বেশি সগৌরবে টিকে আছে।