২০২৬ সালের জুলাই মাস স্প্যানিশ ফুটবলের ইতিহাসে অন্যতম সেরা সময় হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। একদিকে ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬ এর সেমিফাইনালে শক্তিশালী ফ্রান্সকে ২-০ গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠেছে স্পেন। অন্যদিকে ফিফার সর্বশেষ র্যাঙ্কিংয়ে পুরুষ ও নারী , উভয় বিভাগেই বিশ্বের এক নম্বর অবস্থান দখল করেছে লা রোজা। বিশ্ব ফুটবলে স্পেনের সোনালি যুগ , একই সময়ে পুরুষ ও নারী, দুই জাতীয় দলকে বিশ্বের শীর্ষে তুলে এনে অনন্য নজির গড়েছে স্পেন। আন্তর্জাতিক ফুটবলের ইতিহাসে এমন কৃতিত্ব খুব কম দেশই অর্জন করতে পেরেছে।
বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে স্পেন এমন এক পারফরম্যান্স দেখিয়েছে, যা ফুটবলপ্রেমীরা বহুদিন মনে রাখবেন। শুরু থেকেই বলের দখল, দ্রুত পাসিং, নিখুঁত প্রেসিং এবং দুর্দান্ত রক্ষণ , সব মিলিয়ে ম্যাচে ফ্রান্সকে খুব বেশি সুযোগই দেয়নি তারা।
বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতা কিলিয়ান এমবাপ্পেকে কার্যত নিষ্ক্রিয় করে রাখে স্প্যানিশ ডিফেন্ডাররা। প্রথমার্ধে এগিয়ে যাওয়ার পর দ্বিতীয়ার্ধেও আক্রমণের ধার বজায় রেখে ২-০ গোলের জয় নিশ্চিত করে লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল। এই জয়ের ফলে ২০১০ সালের পর আবারও বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠেছে স্পেন।
বিশ্বকাপে ধারাবাহিক সাফল্যের প্রভাব পড়েছে ফিফা র্যাঙ্কিংয়েও। বর্তমান লাইভ ফিফা পুরুষ র্যাঙ্কিং অনুযায়ী শীর্ষ পাঁচ দল :
বিশ্বের শীর্ষ ৫ দল
| অবস্থান | দেশ | পয়েন্ট |
|---|---|---|
| ১ | স্পেন | ১৯৬৫.৬১ |
| ২ | ফ্রান্স | ১৯৪৮.৯৭ |
| ৩ | আর্জেন্টিনা | ১৯৪৩.৪৭ |
| ৪ | ইংল্যান্ড | ১৮৮৯.৪২ |
| ৫ | ব্রাজিল | ১৮০৪.৯২ |
শুধু পুরুষ ফুটবল নয়, নারী ফুটবলেও স্পেন বর্তমানে বিশ্বের সেরা।
সর্বশেষ ফিফা নারী র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ পাঁচ :
শীর্ষ ৫ দল (সর্বশেষ প্রকাশিত র্যাঙ্কিং)
| অবস্থান | দেশ | পয়েন্ট |
|---|---|---|
| ১ | স্পেন | ২১০৫.৩৬ |
| ২ | যুক্তরাষ্ট্র | ২০৫৭.৯২ |
| ৩ | জার্মানি | ২০২৮.৯৯ |
| ৪ | ইংল্যান্ড | ২০২৭.১৩ |
| ৫ | জাপান | ১৯৯৮.৮৩ |
এটি প্রমাণ করে, স্পেনের সাফল্য শুধু একটি দল বা একটি প্রজন্মের নয়; বরং পুরো দেশের ফুটবল কাঠামোর শক্তির প্রতিফলন।
বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে একই সময়ে পুরুষ ও নারী , উভয় বিভাগে ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের এক নম্বর অবস্থানে থাকা সবসময়ই বিরল কৃতিত্ব হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। দীর্ঘদিন এই গৌরবের একমাত্র মালিক ছিল জার্মানি। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্প্যানিশ ফুটবলের ধারাবাহিক সাফল্য সেই ইতিহাস বদলে দিয়েছে। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ফ্রান্সকে ২-০ গোলে হারিয়ে ফাইনালে ওঠার পর স্পেনের পুরুষ দল লাইভ ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে ১৯৬৫.৬১ পয়েন্ট নিয়ে আবারও শীর্ষে উঠে আসে। অন্যদিকে ২১০৫.৩৬ পয়েন্ট নিয়ে নারী দলও নিজেদের এক নম্বর অবস্থান ধরে রেখেছে। এর মধ্য দিয়ে ইতিহাসে প্রথম ও একমাত্র দেশ হিসেবে তৃতীয়বারের মতো একই সময়ে পুরুষ ও নারী , উভয় বিভাগে বিশ্বের এক নম্বর দল হওয়ার অনন্য কীর্তি গড়েছে স্পেন।
স্পেনের এই অসাধারণ যাত্রার শুরু ২০২৩ সালের শেষ দিকে। ওই বছরের আগস্টে নারী বিশ্বকাপ জিতে ইতিহাস গড়ে স্পেনের নারী দল। এরপর ১৫ ডিসেম্বর প্রকাশিত ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে তারা প্রথমবারের মতো বিশ্বের এক নম্বর দল হয়। একই সময়ে স্পেনের পুরুষ দলও শীর্ষস্থান ধরে রাখায়, জার্মানির পর বিশ্বের দ্বিতীয় দেশ হিসেবে স্পেন পুরুষ ও নারী , উভয় বিভাগে একসঙ্গে ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষে উঠে আসে।
পরবর্তী সময়ে র্যাঙ্কিংয়ে কিছু পরিবর্তন এলেও স্পেনের আধিপত্য থেমে থাকেনি। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে নেশনস লিগ ও বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে ধারাবাহিক সাফল্যের সুবাদে ১৮ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে পুরুষ দল আবারও বিশ্বের এক নম্বর স্থান ফিরে পায়। একই সময়ে নারী দলও শীর্ষস্থান ধরে রাখে। ফলে দ্বিতীয়বারের মতো পুরুষ ও নারী , দুই বিভাগেই একই সঙ্গে বিশ্বের সেরা দল হওয়ার গৌরব অর্জন করে স্পেন।
২০২৬ বিশ্বকাপে স্পেনের পারফরম্যান্স সেই সাফল্যকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডায় অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে শক্তিশালী ফ্রান্সকে ২-০ গোলে হারিয়ে ফাইনাল নিশ্চিত করে লা রোজা। এই জয়ের পর লাইভ ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে স্পেন ১৯৬৫.৬১ পয়েন্ট নিয়ে আর্জেন্টিনাকে পেছনে ফেলে আবারও পুরুষ বিভাগের এক নম্বরে উঠে আসে। একই সময়ে নারী দল ২১০৫.৩৬ পয়েন্ট নিয়ে আগের মতোই বিশ্বের শীর্ষে রয়েছে।
এই অর্জনের মাধ্যমে ইতিহাসে প্রথম ও একমাত্র দেশ হিসেবে স্পেন মোট তিনবার একই সময়ে পুরুষ ও নারী , উভয় বিভাগে ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের এক নম্বর দল হওয়ার নজির গড়েছে। এর আগে জার্মানি ২০০৩ সালে প্রথমবার একই সময়ে পুরুষ ও নারী , উভয় বিভাগে ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষস্থান (১ নম্বর) অর্জন করলেও তারা কখনো তিনবার একই সঙ্গে দুই বিভাগে শীর্ষে উঠতে পারেনি। তাই স্পেন শুধু জার্মানির পাশে নয়, বরং নতুন এক ইতিহাস রচনা করে বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সফল পরাশক্তি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্পেনের এই ধারাবাহিক সাফল্যের পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে।
লা মাসিয়া, রিয়াল মাদ্রিদ, রিয়াল সোসিয়েদাদ, অ্যাথলেটিক বিলবাও ও ভিয়ারিয়ালের মতো ক্লাবগুলো নিয়মিত আন্তর্জাতিক মানের ফুটবলার তৈরি করছে। সেই খেলোয়াড়রাই জাতীয় দলে এসে একই দর্শনের ফুটবল খেলছেন।
অনেকেই ভাবতে পারেন এটি হয়তো একটি ভালো সময়ের ফল। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন।
গত কয়েক বছরে স্পেন :
এগুলো একসঙ্গে প্রমাণ করে, স্পেন এখন বিশ্বের সবচেয়ে সফল ফুটবল কাঠামোগুলোর একটি।
এক সময় “টিকি-টাকা” ফুটবলের জন্য পরিচিত ছিল স্পেন।
এখন সেই দর্শনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে :
ফলে শুধু ম্যাচ জেতাই নয়, ধারাবাহিকভাবে সেরা থাকার সংস্কৃতিও তৈরি করেছে স্পেন।
বিশ্ব ফুটবলে স্পেনের স্বর্ণযুগ
বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠা যেমন বড় অর্জন, তেমনি একই সময়ে পুরুষ ও নারী, দুই বিভাগেই ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষে থাকা আরও বড় বার্তা বহন করে। এটি দেখিয়ে দেয় যে স্পেনের সাফল্য কোনো একক তারকার ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং একটি সুপরিকল্পিত ফুটবল সংস্কৃতি, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ এবং ধারাবাহিক উন্নয়নের ফল।
জার্মানির পর এখন স্পেনও সেই বিশেষ তালিকায় নাম লিখিয়েছে, যেখানে একই সঙ্গে পুরুষ ও নারী , দুই জাতীয় দলই বিশ্বের সেরা। বিশ্বকাপের ট্রফি জিততে পারলে ২০২৬ সাল নিঃসন্দেহে স্প্যানিশ ফুটবলের ইতিহাসে সর্বকালের অন্যতম সেরা বছর হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
Source : FIFA