ফুটবল ইতিহাসে এমন কিছু খেলোয়াড় আছেন, যাদের পরিসংখ্যান দিয়ে পুরোপুরি বিচার করা যায় না। গোলসংখ্যা কিংবা ট্রফির তালিকার বাইরেও তারা স্মরণীয় হয়ে থাকেন তাদের খেলার সৌন্দর্য, গতি, সাহস এবং স্মরণীয় মুহূর্তগুলোর জন্য। আর্জেন্টিনার ক্লদিও পল ক্যানিজিয়া ঠিক তেমনই এক কিংবদন্তি। তাঁকে বলা হতো ‘এল হিজো দেল ভিয়েন্তো’ অর্থাৎ ‘বাতাসের পুত্র’ যার গতিতে লেখা হয়েছিল আর্জেন্টিনার ফুটবল মহাকাব্য । কারণ, বল পায়ে তাঁর দৌড় যেন বাতাসকেও হার মানাত।
১৯৯০ সালের ইতালি বিশ্বকাপ। তুরিনের দেল্লে আল্পি স্টেডিয়ামে দ্বিতীয় রাউন্ডে মুখোমুখি দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা।পুরো ম্যাচজুড়ে ব্রাজিলের একের পর এক আক্রমণে কোণঠাসা হয়ে পড়েছিল দিয়েগো ম্যারাডোনার দল। গোলের সুযোগ তৈরি করেও বারবার ব্যর্থ হচ্ছিল সেলেসাওরা। মনে হচ্ছিল, গোলটা শুধু সময়ের অপেক্ষা। কিন্তু ফুটবল কখনো কখনো এক মুহূর্তেই বদলে যায়।
ম্যাচের ৮১ মিনিটে মাঝমাঠে বল পেলেন দিয়েগো ম্যারাডোনা। চারপাশে ব্রাজিলের কয়েকজন ডিফেন্ডার। অসাধারণ ড্রিবলিংয়ে সবাইকে কাটিয়ে হঠাৎই বাড়িয়ে দিলেন এক জাদুকরী থ্রু পাস।
রক্ষণের ফাঁক গলে বিদ্যুৎগতিতে ছুটে গেলেন লম্বা সোনালী চুলের এক তরুণ। ব্রাজিলের গোলরক্ষক ক্লদিও তাফারেলকে নিখুঁত ডামিতে পরাস্ত করে বল পাঠিয়ে দিলেন জালে। স্তব্ধ হয়ে গেল পুরো স্টেডিয়াম।
সেই গোলদাতার নাম ক্লদিও ক্যানিজিয়া। আর্জেন্টিনা জিতল ১-০ ব্যবধানে। বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম সেরা কাউন্টার অ্যাটাকের সেই গোল আজও ফুটবলপ্রেমীদের স্মৃতিতে অমলিন।
ক্যানিজিয়ার সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল তাঁর বিস্ময়কর গতি। শোনা যায়, ১০০ মিটার স্প্রিন্ট শেষ করতে তাঁর সময় লাগত মাত্র ১০.৭ সেকেন্ড। ফুটবলার না হলে অনায়াসেই একজন আন্তর্জাতিক স্প্রিন্টার হতে পারতেন তিনি। বল পায়ে গতি বাড়ালে প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের সামনে একটাই পথ খোলা থাকত, ফাউল করা। তাঁর স্পিড, দিক পরিবর্তনের ক্ষমতা এবং নিখুঁত ফিনিশিং তাঁকে নব্বইয়ের দশকের অন্যতম ভয়ঙ্কর ফরোয়ার্ডে পরিণত করেছিল।
১৯৯০ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে তুলতে ক্যানিজিয়ার অবদান ছিল অসাধারণ। কিন্তু সেমিফাইনালে ইতালির বিপক্ষে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখে ফাইনালের জন্য নিষিদ্ধ হন তিনি।
রোমের সেই ফাইনালে পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে ক্যানিজিয়ার অনুপস্থিতি স্পষ্টভাবে অনুভব করেছিল আর্জেন্টিনা। ম্যাচটি ১-০ ব্যবধানে হেরে রানার্স-আপ হয় ম্যারাডোনার দল। ফুটবল ইতিহাসবিদদের অনেকেই মনে করেন, ক্যানিজিয়া মাঠে থাকলে সেই ফাইনালের ফল অন্যরকমও হতে পারত।
মাঠে ম্যারাডোনা ও ক্যানিজিয়ার বোঝাপড়া ছিল প্রায় টেলিপ্যাথিক। ম্যারাডোনা অনেক সময় না তাকিয়েই বুঝে যেতেন, ক্যানিজিয়া কোন দিকে দৌড় শুরু করেছেন। এই বোঝাপড়ার সবচেয়ে সুন্দর উদাহরণ ১৯৯৪ সালের যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপে নাইজেরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচ।

দ্রুত ফ্রি-কিক নিয়ে ক্যানিজিয়াকে বল বাড়িয়েছিলেন ম্যারাডোনা। আর নিখুঁত ফিনিশিংয়ে গোল করেছিলেন ক্যানিজিয়া। গোলের পর দুজনের আবেগঘন আলিঙ্গনের সেই মুহূর্ত আজও বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় ছবি। মাঠের বাইরেও তাঁদের বন্ধুত্ব ছিল কিংবদন্তিতুল্য।
আর্জেন্টিনার ঐতিহ্যবাহী ক্লাব রিভার প্লেট থেকেই উঠে আসেন ক্যানিজিয়া। এরপর ইতালির সিরি-এতে আতালান্তা ও রোমার জার্সিতে নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন। ম্যারাডোনার আহ্বানে যোগ দেন বোকা জুনিয়র্সে। ক্যারিয়ারের শেষদিকে স্কটল্যান্ডের ঐতিহ্যবাহী ক্লাব রেঞ্জার্স-এর হয়েও সফল সময় কাটান তিনি। দেশ-বিদেশ মিলিয়ে প্রতিটি দলেই তাঁর গতি ও আক্রমণাত্মক ফুটবল ছিল দর্শকদের অন্যতম আকর্ষণ।
আজকের ফুটবল অনেক বেশি কৌশলনির্ভর। ডাটা, প্রেসিং, ট্যাকটিক্স আর ফিটনেসের হিসাবেই যেন সবকিছু মাপা হয়। কিন্তু ক্যানিজিয়া ছিলেন ভিন্ন।
কপালে সরু হেয়ারব্যান্ড, বাতাসে উড়তে থাকা সোনালী চুল, চোখধাঁধানো গতি আর রক্ষণের বুক চিরে এগিয়ে যাওয়ার দৃশ্য, এসবই তাঁকে ফুটবল রোমান্টিকদের হৃদয়ে অমর করে রেখেছে। তিনি শুধু গোল করতেন না, তিনি দর্শকদের আনন্দ দিতেন।
আর্জেন্টিনা বহু কিংবদন্তি স্ট্রাইকার পেয়েছে, গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা, হার্নান ক্রেসপো, গনসালো হিগুয়েইন, সার্জিও আগুয়েরো কিংবা জুলিয়ান আলভারেজ।
তবু ক্লদিও ক্যানিজিয়া আলাদা।
কারণ, তিনি শুধু একজন গোলদাতা ছিলেন না; তিনি ছিলেন গতির প্রতীক, নান্দনিকতার প্রতীক এবং ম্যারাডোনার সবচেয়ে বিশ্বস্ত আক্রমণসঙ্গী।
ফুটবল ইতিহাসে তাঁর নাম উচ্চারিত হবে সবসময় এক বিশেষ পরিচয়ে, ‘এল হিজো দেল ভিয়েন্তো’, বাতাসের পুত্র; যিনি তাঁর অবিশ্বাস্য গতি, দুর্দান্ত ফিনিশিং এবং শিল্পময় ফুটবল দিয়ে খেলাটিকে রূপ দিয়েছিলেন এক জীবন্ত কাব্যে।