July 16, 2026, 7:40 AM

ফ্রান্সকে রুখে দিয়ে বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেন

খেলা প্রতিবেদক
প্রকাশ ১৫ জুলাই, ২০২৬
বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেন

ইংল্যান্ডের থ্রি লায়ন্স এবং আর্জেন্টিনার লা আলবিসেলেস্তে, উভয় দলের প্রতি পূর্ণ সম্মান রেখেই বলা যায়, ২৪ ঘণ্টা পর আটলান্টায় হ্যারি কেন এবং লিওনেল মেসিদের মধ্যকার লড়াইয়ের চেয়েও বেশি উত্তেজনা ছড়িয়েছিল মঙ্গলবার রাতে অনুষ্ঠিত প্রথম সেমিফাইনালটি। ডালাসের ডালাস স্টেডিয়ামে কাউবয়দের নীল-রূপালি রঙের বদলে গ্যালারি ছেয়ে গিয়েছিল ফ্রান্সের নীল আর স্পেনের লাল রঙে। মাঠের ভেতরে ও বেঞ্চে থাকা প্রতিভার ছড়াছড়ি বিবেচনায় ফ্রান্স ও স্পেনের এই হাইভোল্টেজ ম্যাচটিকে অনেকেই আখ্যা দিয়েছিলেন ‘ফাইনালের আগেই ফাইনাল’ হিসেবে। তবে দুই বিশ্বসেরা দলের মধ্যকার সেই জমজমাট লড়াই শেষ পর্যন্ত রূপান্তরিত হলো স্পেনের একচ্ছত্র আধিপত্য ও জাদুকরি পারফরম্যান্সে। প্রথমার্ধ ও দ্বিতীয়ার্ধের শুরুর দিকের দুটি গোল এবং ইস্পাতকঠিন রক্ষণভাগের ওপর ভর করে ফ্রান্সকে ২-০ ব্যবধানে হারিয়ে বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেন ।

ফ্রান্সকে রুখে দিয়ে বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেন

স্পেনের একচ্ছত্র আধিপত্যে বিধ্বস্ত ফ্রান্স

তবে দুই বিশ্বসেরা দলের মধ্যকার সেই জমজমাট লড়াই শেষ পর্যন্ত রূপান্তরিত হলো স্পেনের একচ্ছত্র আধিপত্য ও জাদুকরি পারফরম্যান্সে। প্রথমার্ধ ও দ্বিতীয়ার্ধের শুরুর দিকের দুটি গোল এবং ইস্পাতকঠিন রক্ষণভাগের ওপর ভর করে ফ্রান্সকে ২-০ ব্যবধানে হারিয়ে ফাইনালে ওঠে স্পেন।

১৬ বছর আগে নিজেদের প্রথম বিশ্বকাপ জেতা ‘লা রোহা’রা আগামী রবিবার নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে শিরোপার লড়াইয়ে মুখোমুখি হবে আর্জেন্টিনা অথবা ইংল্যান্ডের। অন্যদিকে, টানা তৃতীয়বারের মতো ফাইনালে ওঠার স্বপ্নভঙ্গ হওয়া ফ্রান্স শনিবার মিয়ামিতে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচের উদ্দেশ্যে টেক্সাস থেকে মায়ামিতে রওনা হবে।

২০২৪ সালের মার্চে কলম্বিয়ার বিরুদ্ধে একটি প্রীতি ম্যাচে হারের পর থেকে টানা ৩৭ ম্যাচে অপরাজিত রয়েছে স্পেন, যার মধ্যে এই টুর্নামেন্টের ৭ ম্যাচে তারা গোল খেয়েছে মাত্র একটি। আর অফিশিয়াল টুর্নামেন্টের কথা ধরলে, ২০২৩ সালের মার্চে স্কটল্যান্ডের কাছে ইউরো বাছাইপর্বে হারার পর থেকে তারা আর কোনো ম্যাচ হারেনি।

কেপ ভার্দের বিরুদ্ধে গোলশূন্য ড্র দিয়ে বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করার পর, বর্তমান ইউরো চ্যাম্পিয়নরা এটি নিয়ে টানা ষষ্ঠ জয় তুলে নিল। স্ট্রাইকার মিকেল ওয়ারজাবালের পেনাল্টি এবং রাইট ব্যাক পেদ্রো পোরোর নিখুঁত ফিনিশিং স্পেনের এই জয় নিশ্চিত করে।

অথচ টুর্নামেন্টের গত ৫ সপ্তাহে সবচেয়ে আকর্ষণীয় দল ছিল ২০১৮-র চ্যাম্পিয়ন ও ২০২২ এর রানার্স-আপ ফ্রান্স। ৬ ম্যাচে ১৬-২ গোলের ব্যবধানে প্রতিপক্ষদের উড়িয়ে সেমিফাইনালে এসেছিল তারা। কিন্তু ফ্রান্সের জাতীয় দিবস ‘বাস্তিল ডে’-তে স্পেনের নিশ্ছিদ্র রক্ষণাত্মক কৌশলের সামনে লে ব্লুজদের কেবল হতাশাই সঙ্গী হয়েছে।

স্প্যানিশ রক্ষণে বন্দি এমবাপ্পে

চলতি বিশ্বকাপে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে এগিয়ে থাকা ফরাসি অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপ্পে এদিন খেলার জন্য খুব একটা ফাঁকা জায়গা পাননি। বল নিয়ে এগোনোর সময় স্প্যানিশ ডিফেন্ডাররা বারবার তাকে ঘিরে ধরে বিপজ্জনক এলাকায় তার বলের স্পর্শ সীমিত করে দেয়। ফলে ফ্রান্সের আগের ম্যাচগুলোতে যেভাবে তিনি একা হাতে মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন, তার পুনরাবৃত্তি এদিন সম্ভব হয়নি।

ম্যাচের আগে বাতাসে কিছুটা উত্তাপ ছড়িয়েছিল যখন খবর আসে যে, তরুণ সেনসেশন লামিন ইয়ামাল বলেছেন যে ফ্রান্সের উচিত স্পেনকে ভয় পাওয়া। মিডিয়াতে এটি নিয়ে বেশ মাতামাতি হলেও খেলোয়াড়রা এই সস্তা বিতর্কে কান দেননি এবং ইয়ামাল পরবর্তীতে ব্যাখ্যা করেন যে তার বক্তব্য ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছিল।

তবে মাঠের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় কোনো কমতি ছিল না। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ২০২৪ ইউরো সেমিফাইনাল এবং ২০২৫ নেশনস লিগের রোমাঞ্চকর ম্যাচ, দু’টিই জিতেছিল লা রোহা-রা। তাছাড়া ঘরোয়া ক্লাব ফুটবলের সুবাদে দুই দলের খেলোয়াড়রাই একে অপরের শক্তি ও দুর্বলতা সম্পর্কে খুব ভালোভাবেই অবগত ছিলেন।

ম্যাচের আগে দুই দলের কেউই এই টুর্নামেন্টের আগের ৬ ম্যাচে কখনো পিছিয়ে পড়েনি। কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়ামের বিরুদ্ধে ম্যাচের আগে স্পেন কোনো গোলই খায়নি, অন্যদিকে ফ্রান্স সেমিফাইনালের আগে টানা তিনটি এবং মোট পাঁচটির মধ্যে চারটিতে ক্লিন শিট রেখেছিল। ফ্রান্সের রক্ষণভাগকে শক্তিশালী করতে হ্যামস্ট্রিং চোট কাটিয়ে দলে ফিরেছিলেন মিডফিল্ডার অরেলিয়ান চুয়ামেনি।

পেনাল্টি থেকে স্পেনের লিড

ডান উইংয়ে ইয়ামালের উপস্থিতি ফরাসি লেফট ব্যাক লুকাস দিনিয়ের জন্য ছিল এক বড় চ্যালেঞ্জ। ম্যাচের শুরুর দিকে দিনিয়ে ভালোই সামলেছিলেন, কিন্তু ইয়ামালকে করা তার ফাউলটিই ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয়। তবে এটি ইয়ামালের গতি বা ড্রিবলিংয়ের কারণে হয়নি।

ফ্রান্সকে রুখে দিয়ে বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেন

মার্ক কুকুরেয়ার একটি ক্রস যখন পেনাল্টি বক্সের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যাচ্ছিল, তখন দিনিয়ে হেড দিয়ে বলটি নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে ভলিতে ক্লিয়ার করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি ইয়ামালের উপস্থিতি খেয়াল করেননি। দিনিয়ে যখন শট নেওয়ার জন্য ঘুরলেন, তখন বলের বদলে ধেয়ে আসা স্প্যানিশ তরুণের বাম উরুতে লাথি মেরে বসেন।

রেফারি ইভান বার্টন কোনো দ্বিধা ছাড়াই পেনাল্টির নির্দেশ দেন। ম্যাচের ২২তম মিনিটে মিকেল ওয়ারজাবাল অত্যন্ত নিখুঁত পেনাল্টি শটে ফরাসি গোলরক্ষক মাইক মাইনানকে পরাস্ত করে বল জালের উপরিভাগের ডান কোণায় জড়ান। এটি ছিল টুর্নামেন্টে তার পঞ্চম গোল।

উইলিয়াম সালিবা’র ইনজুরি, বিপদে ফ্রান্স

এর কিছুক্ষণ পরেই ফ্রান্সের সমস্যা আরও ঘনীভূত হয়। কোনো চাপ ছাড়াই বলের পেছনে দৌড়ানোর সময় পিঠের চোটের কারণে মাঠ ছাড়তে বাধ্য হন সেন্টার ব্যাক উইলিয়াম সালিবা। টুর্নামেন্টে এর আগে মাত্র একটি ম্যাচ খেলা মাক্সেন্স লাক্রোয়া তার পরিবর্তে মাঠে নামেন। সালিবার বিদায়ের পর ফরাসি রক্ষণভাগ কিছুটা এলোমেলো হয়ে পড়ে।

ফ্রান্সকে রুখে দিয়ে বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেন
উইলিয়াম সালিবা – গেটি ইমেজেস

প্রথমার্ধের ৩৮তম মিনিটে স্পেনের হাই-প্রেসের কারণে ফ্রান্স বলের নিয়ন্ত্রণ হারায়। বক্সে ইয়ামাল ও দানি ওলমোর ওয়ান-টাচ ফুটবলের পর ইয়ামাল ক্রস বাড়িয়েছিলেন ফাবিয়ান রুইজের উদ্দেশ্যে, তবে দায়ো উপামেকানো শেষ মুহূর্তে তা প্রতিহত করেন।

ইতিহাস বলছিল, বিশ্বকাপে প্রথমার্ধে পিছিয়ে পড়ার পর ফ্রান্স কখনো ম্যাচ জিততে পারেনি। সেই ইতিহাস বদলাতে দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই একটি পরিবর্তন আনেন ফরাসি কোচ। কার্ডের ঝুঁকিতে থাকা আদ্রিয়েন রাবিওকে তুলে মাঠে নামানো হয় মানু কোনেকে। তবুও ফরাসিদের খেলায় কোনো ধার না আসায় ৫৭তম মিনিটে দিদিয়ের দেশম তার বেঞ্চ থেকে ব্র্যাডলি বারকোলার পরিবর্তে ফরোয়ার্ড দেজিরে দুয়েকে মাঠে নামান।

ফ্রান্সকে রুখে দিয়ে বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেন
প্লেয়ার অব দ্য ম্যাচ: পেদ্রো পোরো

কিন্তু এর ঠিক এক মিনিট পরেই ব্যবধান দ্বিগুণ করে স্পেন

পেদ্রো পোরো বক্সের মাথায় দানি ওলমোকে পাস দিয়ে নিজেই ভেতরের দিকে দৌড় লাগান। কোনে এবং দুয়ে কেবল তার দৌড়ই দেখছিলেন, তাকে আটকানোর চেষ্টা করেননি। উপামেকানো ওলমোকে ফাউল করে ফেলে দেওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে ওলমো পাসটি বাড়িয়ে দেন পোরোর দিকে। সম্পূর্ণ ফাঁকা জায়গায় বল পেয়ে পোরো অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায় মাইনানকে পরাস্ত করে বল জালে জড়ান। এটি টুর্নামেন্টে তার দ্বিতীয় গোল।

ফ্রান্সকে রুখে দিয়ে বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেন
পেদ্রো পোরো

খানিক বাদে পাউ কুবারসির একটি চমৎকার থ্রু বল ধরে ইয়ামাল গোল করলেও অফসাইডের কারণে তা বাতিল হয়। ম্যাচের শেষ দিকে সমতা ফেরাতে ফ্রান্স অলআউট আক্রমণে যায়। ৭৩তম মিনিটে দেশম তার শেষ দুটি পরিবর্তনও করে ফেলেন। ফরাসিদের আক্রমণে মরিয়া ভাব স্পষ্ট ছিল, বেশ কিছু বিপজ্জনক সুযোগও তৈরি হয়েছিল, কিন্তু স্পেনের ইস্পাতকঠিন ডিফেন্সের সামনে তার সবটাই ভেস্তে যায়। শেষ পর্যন্ত পুরো ম্যাচজুড়ে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রেখেই মাঠ ছাড়ে স্পেন।


এই ক্যাটাগরির আরো খবর
Theme Created By ThemesDealer.Com