ফুটবল বিশ্বকাপ মানেই বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া আসর। আর সেই আসরের ফাইনাল ম্যাচকে আরও বর্ণিল ও বৈশ্বিক বিনোদনের মঞ্চে রূপ দিতে বড় পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে ফিফা। প্রথমবারের মতো প্রচলিত ১৫ মিনিটের বদলে বিশ্বকাপ ফাইনালে ৩০ মিনিটের বিরতি রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে। সেই বিরতিতে অনুষ্ঠিত হবে একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। যেখানে পারফর্ম করতে পারেন শাকিরা, ম্যাডোনা, বিটিএস, জাস্টিন বিবার, বার্না বয়সহ একাধিক আন্তর্জাতিক তারকা।
ফিফার এই উদ্যোগ ইতোমধ্যেই বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কেউ একে বিশ্বকাপের নতুন যুগের সূচনা বলছেন, আবার অনেকে মনে করছেন, এটি ফুটবলের ঐতিহ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
ফিফার পরিকল্পনা অনুযায়ী, ফাইনাল ম্যাচের বিরতি ২৫ থেকে ৩০ মিনিট পর্যন্ত হতে পারে। তবে পুরো সময়জুড়ে সংগীতানুষ্ঠান চলবে না। মূল পারফরম্যান্সের দৈর্ঘ্য হবে প্রায় ১১ মিনিট। বাকি সময় মাঠ প্রস্তুত করা, শিল্পীদের মঞ্চ সরিয়ে ফেলা এবং খেলোয়াড়দের ড্রেসিংরুমে কৌশল নির্ধারণের জন্য রাখা হবে।
এই মেগা আয়োজনের কিউরেশনের দায়িত্বে রয়েছেন ব্রিটিশ ব্যান্ড কোল্ডপ্লে-এর প্রধান গায়ক ক্রিস মার্টিন। সম্ভাব্য পারফর্মারদের তালিকায় রয়েছেন শাকিরা, ম্যাডোনা, বিটিএস, জাস্টিন বিবার, বার্না বয় ও অর্কেস্ট্রা কন্ডাক্টর গুস্তাভো দুদামেল।
ফিফার এই উদ্যোগের পেছনে রয়েছে দুটি বড় লক্ষ্য।
প্রথমত, ‘FIFA Global Citizen Education Fund’-এর মাধ্যমে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষার জন্য তহবিল সংগ্রহ। বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় মঞ্চকে ব্যবহার করে এই সামাজিক উদ্যোগে বৈশ্বিক সমর্থন বাড়াতে চায় সংস্থাটি।
দ্বিতীয়ত, ফুটবলের বাইরের দর্শকদেরও বিশ্বকাপের সঙ্গে যুক্ত করা। বিটিএস, জাস্টিন বিবার বা শাকিরার কোটি কোটি ভক্তকে বিশ্বকাপের সম্প্রচারে ধরে রাখলে দর্শকসংখ্যা ও বাণিজ্যিক আয়—দুইই বাড়বে বলে মনে করছে ফিফা।
ফিফার এই পরিকল্পনা নিয়ে ফুটবল অঙ্গনে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হাফটাইম দীর্ঘ হলে খেলোয়াড়দের শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা কমে যেতে পারে। দীর্ঘ বিরতির পর আবার সর্বোচ্চ গতির ফুটবলে ফিরলে পেশিতে টান, হ্যামস্ট্রিং ইনজুরি কিংবা অন্যান্য শারীরিক সমস্যার ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে।
এছাড়া ইন্টারন্যাশনাল ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন বোর্ড (IFAB)-এর নিয়ম অনুযায়ী, হাফটাইম সাধারণত ১৫ মিনিটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। তাই এই পরিবর্তন বাস্তবায়নে নিয়মগত বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
আরেকটি বড় প্রশ্ন উঠেছে ফুটবলের ঐতিহ্য নিয়ে। অনেক সমর্থকের মতে, বিশ্বকাপ ফাইনাল কোনো কনসার্ট নয়। আমেরিকান ফুটবলের সুপার বোলের আদলে ফুটবলকে অতিরিক্ত বিনোদননির্ভর করে তুললে খেলার নিজস্ব আবেগ ও স্বাতন্ত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
একদল সমর্থক মনে করছেন, বিশ্বকাপের মতো আসরে এমন জমকালো আয়োজন নতুন দর্শক তৈরি করবে এবং ফুটবলের জনপ্রিয়তা আরও বাড়াবে।
অন্যদিকে ঐতিহ্যবাদীদের দাবি, বিশ্বকাপের মূল আকর্ষণ হওয়া উচিত শুধুই ফুটবল। ম্যাচের মাঝখানে দীর্ঘ বিরতি দর্শক ও খেলোয়াড়, উভয়ের মনোযোগেই প্রভাব ফেলতে পারে।
ফুটবল ও বিনোদনের সমন্বয় নতুন কিছু নয়। তবে বিশ্বকাপ ফাইনালের মতো ঐতিহাসিক ম্যাচে ৩০ মিনিটের হাফটাইম চালুর পরিকল্পনা নিঃসন্দেহে একটি বড় পরিবর্তন। এটি একদিকে যেমন নতুন বাণিজ্যিক সম্ভাবনার দুয়ার খুলতে পারে, অন্যদিকে খেলোয়াড়দের শারীরিক প্রস্তুতি, ফুটবলের ঐতিহ্য এবং ম্যাচের স্বাভাবিক ছন্দ নিয়েও তৈরি করেছে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
এখন দেখার বিষয়, ফিফা এই পরিকল্পনা কীভাবে বাস্তবায়ন করে এবং ফুটবল বিশ্ব শেষ পর্যন্ত এটিকে কতটা গ্রহণ করে।