২০২৭ সালের আইসিসি ওয়ানডে বিশ্বকাপ ক্রিকেটের নতুন ফরম্যাট প্রকাশের পর ক্রিকেটের সহযোগী (অ্যাসোসিয়েট) দেশগুলোর মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। আইসিসি টুর্নামেন্টে ১৪টি দল রাখলেও নতুন করে ‘সুপার সিরিজ’ ও ‘সুপার সেভেন’ পর্ব যুক্ত করায় সুযোগ কমে যাবে বলে অভিযোগ তুলেছেন নেদারল্যান্ডস, নামিবিয়া ও স্কটল্যান্ডের অধিনায়করা। তাদের মতে, এই পরিবর্তন বিশ্ব ক্রিকেটকে সম্প্রসারণের বদলে উল্টো ছোট দেশগুলোর জন্য বড় মঞ্চে প্রতিযোগিতার সুযোগ সীমিত করবে।
দক্ষিণ আফ্রিকা, জিম্বাবুয়ে ও নামিবিয়ায় অনুষ্ঠিতব্য ২০২৭ বিশ্বকাপে আগের দুই আসরের (২০১৯ ও ২০২৩) ১০ দলের পরিবর্তে ১৪টি দল অংশ নেবে। তবে টুর্নামেন্টের শুরুতেই নিচের সারির তিনটি করে দল নিয়ে ‘সুপার সিরিজ’ আয়োজন করা হবে। এই পর্বে প্রতিটি দল মাত্র দুটি ম্যাচ খেলবে এবং প্রতিটি গ্রুপ থেকে একটি করে দল বিদায় নেবে। অর্থাৎ দুটি দল বিশ্বকাপে মাত্র দুই ম্যাচ খেলেই টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে যাবে।
এই সিদ্ধান্তে সবচেয়ে বেশি ক্ষুব্ধ সহযোগী দেশগুলোর ক্রিকেটাররা। কারণ তাদের ধারণা, নতুন ফরম্যাটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়বে অ্যাসোসিয়েট দলগুলোর ওপর। একই সঙ্গে তারা প্রশ্ন তুলেছেন চলমান ক্রিকেট বিশ্বকাপ লিগ-২-এর গুরুত্ব নিয়েও। এই প্রতিযোগিতায় আটটি সহযোগী দল ৩৬টি করে ম্যাচ খেলছে শুধু বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে জায়গা নিশ্চিত করার জন্য।
বিশ্ব ক্রিকেটারদের সংগঠন ওয়ার্ল্ড ক্রিকেটার্স অ্যাসোসিয়েশন (ডব্লিউসিএ)-এর প্রকাশিত বিবৃতিতে নেদারল্যান্ডসের অধিনায়ক স্কট এডওয়ার্ডস বলেন,
একটি দেশের জন্য ওয়ানডে বিশ্বকাপে জায়গা করে নেওয়া বিশাল অর্জন। বছরের পর বছর পরিকল্পনার পর সেই সুযোগের বাস্তবতা যদি হঠাৎ বদলে যায়, তাহলে তা ভীষণ হতাশাজনক।
তিনি আরও বলেন,
আইসিসি সবসময় ক্রিকেটকে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দেওয়ার কথা বলে। কিন্তু এমন সিদ্ধান্ত সহযোগী দেশগুলোর জন্য বিশ্বের সেরা দলগুলোর বিপক্ষে খেলার সুযোগ আরও কমিয়ে দেয়। এই ধরনের ম্যাচই একটি দেশকে উন্নতি করতে সাহায্য করে এবং নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে। যদি সত্যিই ক্রিকেটকে বৈশ্বিক খেলায় পরিণত করতে চাই, তাহলে সুযোগ বাড়ানো উচিত, কমানো নয়।
২০২৩ সালের বিশ্বকাপে নেদারল্যান্ডস আয়ারল্যান্ড, জিম্বাবুয়ে ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের মতো টেস্ট খেলুড়ে দলকে পেছনে ফেলে জায়গা করে নেয়। শুধু তাই নয়, বিশ্বকাপে দক্ষিণ আফ্রিকা ও বাংলাদেশকে হারিয়ে বড় দু’টি অঘটনও ঘটায় তারা। তবে সেই সাফল্যের পরও নেদারল্যান্ডস আর কোনো আইসিসি পূর্ণ সদস্য দেশের বিপক্ষে ওয়ানডে খেলার সুযোগ পায়নি।

নামিবিয়ার অধিনায়ক গেরহার্ড ইরাসমাস বলেন,
অনেক দেশের ক্রিকেটারদের জন্য ওয়ানডে বিশ্বকাপ শুধু আরেকটি টুর্নামেন্ট নয়। এটি এমন একটি আসর, যাকে ঘিরে ক্যারিয়ার গড়ে ওঠে এবং নতুন প্রজন্ম স্বপ্ন দেখে। আমরা জানি, বিশ্বকাপে জায়গা অর্জন করতে হয়। কিন্তু যোগ্যতা অর্জনের পর সবচেয়ে বড় মঞ্চে সত্যিকারের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগও থাকা উচিত। সহযোগী দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরেই সীমিত সুযোগের মধ্যে রয়েছে।
আইসিসির সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ারও সমালোচনা করেছে ডব্লিউসিএ। সংগঠনটির প্রধান নির্বাহী টম মফ্যাটের অভিযোগ, পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, যোগাযোগ এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যথাযথ পরামর্শের অভাব ছিল।

মফ্যাট বলেন,
বিশ্ব ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে আইসিসি অবশ্যই তাদের বৈশ্বিক টুর্নামেন্টের কাঠামো নির্ধারণ করতে পারে। কিন্তু যখন কোনো প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, বাছাইপর্বের পথ নির্ধারণ করা হয় এবং দেশ ও খেলোয়াড়রা বছরের পর বছর সেই লক্ষ্য অর্জনে বিনিয়োগ করে, তখন এত বড় পরিবর্তনের আগে প্রকৃত পরামর্শ, স্বচ্ছতা এবং স্পষ্ট ব্যাখ্যা থাকা উচিত ছিল।
উল্লেখ্য, পাঁচ বছর আগে আইসিসি যখন ১৪ দলের বিশ্বকাপের ঘোষণা দেয়, তখন পরিকল্পনা ছিল সাতটি করে দুটি গ্রুপ হবে। এরপর অনুষ্ঠিত হবে ‘সুপার সিক্স’ পর্ব। সেই পরিকল্পনা ধরেই দলগুলো দীর্ঘদিন প্রস্তুতি নিয়েছে। কিন্তু বিশ্বকাপের মাত্র ১৫ মাস আগে এসে পুরো ফরম্যাট বদলে দেওয়া হয়েছে।
স্কটল্যান্ডের অধিনায়ক রিচি বেরিংটনও সিদ্ধান্ত গ্রহণে খেলোয়াড়দের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। তিনি বলেন,
সব সিদ্ধান্ত খেলোয়াড়রা নেবে, এমন প্রত্যাশা আমাদের নেই। তবে যেসব সিদ্ধান্ত খেলোয়াড়দের ক্যারিয়ার ও ক্রিকেটের ওপর বড় প্রভাব ফেলে, সেসব ক্ষেত্রে অন্তত আমাদের সঙ্গে অর্থবহ আলোচনা হওয়া উচিত। বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি বিবেচনায় নিলে আরও ভালো সিদ্ধান্ত আসে।
স্কটল্যান্ডের ওপেনার জর্জ মানসি আরও কড়া ভাষায় সমালোচনা করে ইএসপিএনক্রিকইনফোকে বলেন,
শীর্ষ তিন দেশ অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড ও ভারত ছাড়া অন্যদের স্বার্থ আইসিসি দেখেনি, এতে আমি মোটেও অবাক নই।
নেদারল্যান্ডসের ম্যাক্স ও’ডাউড এবং লোগান ভ্যান বিকও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন ফরম্যাট নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়ের ১২ নম্বরে থাকা আয়ারল্যান্ডের ওয়ানডে অধিনায়ক পল স্টার্লিং উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছেন চলমান ৪৮ দলের ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপকে। তার মতে, তুলনামূলক ছোট দেশগুলোও বিশ্বমঞ্চে কতটা আগ্রহ ও মূল্য যোগ করতে পারে, ফুটবল সেটি দেখিয়ে দিয়েছে। তিনি বলেন, “ক্রিকেটও যদি একই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করে, তাহলে খেলাটির আরও বেশি বিস্তার ঘটবে।”
অন্যদিকে আইসিসি নতুন ফরম্যাটের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। বুধবার প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সংস্থাটি জানায়, এই “পরিবর্তিত” ফরম্যাট বিশ্বকাপকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলবে এবং দর্শকদের অভিজ্ঞতা উন্নত করবে। একই সঙ্গে উদীয়মান দলগুলোর জন্যও ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় মঞ্চে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ বজায় থাকবে বলে দাবি করেছে আইসিসি।
আইসিসির দীর্ঘদিনের অবস্থান হলো, বিশ্বব্যাপী ক্রিকেট বিস্তারের প্রধান মাধ্যম টি-টোয়েন্টি। সেই কারণেই সম্প্রতি পুরুষদের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে দলের সংখ্যা বাড়িয়ে ২০ করা হয়েছে। তবে ওয়ানডে বিশ্বকাপের নতুন ফরম্যাট ঘিরে সহযোগী দেশগুলোর ক্ষোভ প্রমাণ করছে, ক্রিকেটের বৈশ্বিক সম্প্রসারণের প্রশ্নে বিতর্ক এখনো শেষ হয়নি।