ফুটবল ইতিহাসে এমন কাকতালীয় ঘটনার নজির খুব কমই আছে। প্রায় ১৯ বছর আগে একটি দাতব্য ফটোশুটে পাঁচ মাস বয়সী এক শিশুকে কোলে নিয়ে গোসল করিয়েছিলেন তরুণ লিওনেল মেসি। সেই শিশুই আজ স্পেনের তারকা লামিনে ইয়ামাল। আর ভাগ্যের অদ্ভুত চক্রে, সেই মেসি ও লামিনে ইয়ামাল দুই ফুটবলারই এবার মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপের ফাইনালে।
বুধবার ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারিয়ে ফাইনালে জায়গা নিশ্চিত করেছে আর্জেন্টিনা। ফলে আগামী ১৯ জুলাই নিউইয়র্ক-নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচে মেসির আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ হবে ইয়ামালের স্পেন। ১৯ বছর বয়সী ইয়ামালকে ইতোমধ্যেই অনেকেই মেসির উত্তরসূরি বা তার সবচেয়ে কাছাকাছি প্রতিভা হিসেবে বিবেচনা করছেন।
তবে এটাই মেসি ও ইয়ামালের প্রথম সাক্ষাৎ নয়। তাদের প্রথম দেখা হয়েছিল প্রায় ১৯ বছর আগে, যখন মেসির বয়স ছিল মাত্র ২০ বছর এবং তিনি বার্সেলোনার হয়ে খেলতেন। অন্যদিকে ইয়ামাল তখন মাত্র পাঁচ মাসের শিশু।
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসে ২০২৪ সালের গ্রীষ্মে। ইউরো জয়ে স্পেনের অন্যতম নায়ক হয়ে ওঠার সময় ইয়ামালের বাবা মুনির নাসরাউই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেই পুরোনো ছবির একটি অংশ প্রকাশ করেন। ছবির ক্যাপশনে তিনি লেখেন, ‘দুই কিংবদন্তির সূচনা।’
ছবিটি প্রকাশের পর প্রথমে অনেকেই বিশ্বাসই করতে পারেননি। স্টুডিওতে তোলা ছবিতে দেখা যায়, একটি ছোট্ট প্লাস্টিকের বাথটাবে থাকা শিশু ইয়ামালকে গোসল করাচ্ছেন মেসি। অনেকের ধারণা হয়েছিল এটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় তৈরি কোনো ছবি। এমনকি স্পেনের জাতীয় দলের মিডফিল্ডার মিকেল মেরিনোও প্রথমে বিভ্রান্ত হয়েছিলেন।
তবে পরে বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস ছবিগুলোর সত্যতা নিশ্চিত করে এবং ওই ফটোশুটের আরও কয়েকটি ছবি প্রকাশ করে।
ঘটনার পেছনের গল্পও বেশ আকর্ষণীয়। ২০০৮ সালের একটি দাতব্য ক্যালেন্ডারের জন্য কাতালান দৈনিক দিওরিও স্পোর্ত ও ইউনিসেফ যৌথভাবে এই বিশেষ ফটোশুটের আয়োজন করেছিল। বিভিন্ন বার্সেলোনা ফুটবলারের সঙ্গে শিশু ও তাদের পরিবারের ছবি তোলার দায়িত্ব পান স্বতন্ত্র আলোকচিত্রী হোয়ান মনফোর্ত।
মনফোর্ত জানান, মাতারোর রোকা ফন্ডা এলাকায় ইউনিসেফ একটি লটারির আয়োজন করেছিল। সেখানে অংশ নিয়েছিল ইয়ামালের পরিবার। ভাগ্যক্রমে তারাই বিজয়ী হয় এবং পুরস্কার হিসেবে ক্যাম্প ন্যুতে এক বার্সেলোনা ফুটবলারের সঙ্গে ছবি তোলার সুযোগ পায়।
২০০৭ সালের শেষ দিকে ক্যাম্প ন্যুর অতিথি দলের ড্রেসিংরুমে অনুষ্ঠিত হয় সেই ফটোশুট। সেখানে ছিলেন পাঁচ মাস বয়সী ইয়ামাল, তার মা শেইলা (শিলা) এবানা এবং তরুণ মেসি।
মনফোর্ত স্মৃতিচারণ করে বলেন, মেসি তখন খুবই লাজুক ও অন্তর্মুখী ছিলেন। শুরুতে তিনি শিশুটিকে কীভাবে কোলে নেবেন, সেটিই বুঝতে পারছিলেন না।
তার ভাষায়,
ঘরে ঢুকেই তিনি দেখলেন পানিভর্তি একটি ছোট প্লাস্টিকের বাথটাব, আর তার ভেতরে একটি শিশু। পরিস্থিতিটা তার জন্য সহজ ছিল না।
এরপর কেটে গেছে প্রায় দুই দশক। সেই শিশু ইয়ামাল এখন বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে আলোচিত তরুণ তারকা। মাত্র ১৫ বছর ৯ মাস ১৬ দিন বয়সে বার্সেলোনার হয়ে অভিষেক করে ক্লাবটির ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ অভিষিক্ত খেলোয়াড়ের রেকর্ড গড়েন। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, মেসি নিজে বার্সেলোনার মূল দলে অভিষেক করেছিলেন ১৭ বছর বয়সে।
এরই মধ্যে ইয়ামাল তিনটি লা লিগা শিরোপা জিতেছেন। ২০২৪ সালে স্পেনকে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ জেতাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ২০২৬ বিশ্বকাপেও দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করেছেন তিনি। উরুগুয়ে, পর্তুগাল, বেলজিয়াম ও ফ্রান্সের বিপক্ষে তার আক্রমণাত্মক ফুটবল নজর কেড়েছে। সেমিফাইনালে স্পেনের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ পেনাল্টি আদায় করেও দলের ফাইনাল নিশ্চিত করতে অবদান রাখেন।
তবে অর্জনের বিচারে ইয়ামালের সামনে এখনো বিশাল পথ বাকি। বার্সেলোনার হয়ে মেসি করেছেন ৬৭২ গোল, জিতেছেন ক্লাব ইতিহাসের সর্বাধিক ব্যালন ডি’অর এবং ২০২২ সালে আর্জেন্টিনাকে এনে দিয়েছেন বিশ্বকাপ শিরোপা।
সম্প্রতি ইয়ামালকে নিয়ে নিজের মূল্যায়নও দিয়েছেন মেসি। তিনি বলেন, “ফুটবলে নতুন প্রজন্মের অনেক অসাধারণ খেলোয়াড় এসেছে। কিন্তু যদি একজনকে বেছে নিতে হয়, তাহলে বয়স, এখন পর্যন্ত যা করেছে এবং ভবিষ্যতে যা করতে পারে, সব বিবেচনায় লামিনে ইয়ামালই সেরা। আমার কোনো সন্দেহ নেই।”
এবারের বিশ্বকাপ ফাইনালকে অনেকেই দেখছেন এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মের হাতে মশাল তুলে দেওয়ার সম্ভাব্য মুহূর্ত হিসেবে। আবার কেউ বলছেন, এটি কেবল দুই ভিন্ন যুগের দুই মহাতারকার লড়াই।
আলোকচিত্রী হোয়ান মনফোর্তের কথায়, “তখন কেউ কল্পনাও করতে পারেনি এই শিশুটি একদিন আজকের ইয়ামাল হবে। যেমন কেউ জানত না, মেসিও একদিন সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার হয়ে উঠবেন। কখনো কখনো নিয়তি সত্যিই নিজের গল্প নিজেই লিখে।”